শিক্ষার আলো ডেস্ক
বছরের প্রথম দিনে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শতভাগ শিক্ষার্থী পাঠ্যবই পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার(১ জানুয়ারি) নতুন বই হাতে পেয়ে আনন্দে উচ্ছ্বসিত ছিল ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। সকাল থেকেই স্কুলমুখী হয়ে তারা রঙিন মলাটের বই বুকে জড়িয়ে ধরে, কেউ কেউ খুশিতে উলটে দেখে পাতা। তবে একই দিনে ভিন্ন চিত্র মাধ্যমিক স্তরে। কোথাও আংশিক বই, কোথাও একেবারেই বই না পাওয়ায় হতাশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। অনেক স্কুল আবার মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের বই নিতে ৪ জানুয়ারি স্কুলে যাওয়ার নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে। জানা গেছে, প্রায় ১২ কোটি পাঠ্যবইয়ের ঘাটতি নিয়েই মাধ্যমিকের পাঠদান শুরু হয়েছে। সব শিক্ষার্থীর হাতে বই তুলে দিতে এবারও মার্চ মাস লেগে যেতে পারে। অনুসন্ধানের তথ্য বলছে, টানা ১৬ বছর সব শিক্ষার্থীর হাতে বছরের শুরুতে বই তুলে দিতে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। বই ছাপা ও বিতরণে ধারাবাহিক এ ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দায়ী করছে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। আর মন্ত্রণালয় বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটিবি ঘিরে যে প্রেস সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা ভাঙতে তারা চেষ্টা করছে। এ চক্র নিয়ন্ত্রণে না আনা গেলে পাঠ্যবই ছাপার কাজে স্বচ্ছতা ও মাননিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
বিনা মূল্যে বই বিতরণ শুরুর বছর ২০১০ সালের ২১ জুলাই পর্যন্ত সময় লেগেছিল শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে। ২০১১ সালে ১২ এপ্রিল, ২০১২ সালে ১৫ এপ্রিল, ২০১৩ সালে ৬ মার্চ, ২০১৪ সালে ১৮ মার্চ, ২০১৫ সালে ৫ মার্চ, ২০১৬ সালে ৬ মার্চ, ২০১৭ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ সালে ১৩ মার্চ, ২০১৯ সালে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সময় লেগেছিল। এরপর আসে মহামারি করোনা ভাইরাস। করোনার কারণে ২০২০, ২০২১ সালে বই ছাপা ও বিতরণের শিডিউল ভেঙে পড়ে। ঐ দুটি বছরের বই ছাপা শেষ করতে জুলাই-আগস্ট পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে ঠিক কবে নাগাদ বই বিতরণ শেষ করা হয়েছিল, তার সঠিক তথ্য এনসিটিবির কাছেও সংরক্ষিত নেই। ২০২২ সালে ২৪ মার্চ পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ শেষ করে এনসিটিবি। এছাড়া ২০২৩ সালে ১৭ মার্চ, ২০২৪ সালে ৮ এপ্রিল এবং ২০২৫ সালে ২৭ মার্চ বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ কাজ শেষ করতে সক্ষম হয় এনসিটিবি। শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে দেরিতে পাঠ্যবই দেওয়ার ক্ষত শিক্ষা খাত ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। প্রতিটি শিক্ষাবর্ষ দেরিতে শুরু হচ্ছে, প্রয়োজনের চেয়েও কম ক্লাস হচ্ছে এবং সিলেবাস শেষ না করেই পরীক্ষা দিয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে উঠছে শিক্ষার্থীরা। এতে শিখন ঘাটতির কবলে পড়ছে শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ৩০ কোটি বই ছাপা ও বিতরণের লক্ষ্য ঠিক করেছিল এনসিটিবি। আর বই ছাপানোর দায়িত্ব পেয়েছিল কেবল দেশি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ৮ কোটি ৫৯ লাখ কপি নতুন বই ছাপা ও বিতরণের কাজ গত ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়েছে। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও এবতেদায়ি পর্যায়ের (মাদ্রাসার প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত) শিক্ষার্থীদের ২১ কোটি ৪৩ লাখ বইয়ের মধ্যে গতকাল পর্যন্ত উপজেলায় পৌঁছেছে ১৫ কোটি ৬১ লাখ বই। বাকি ৫ কোটি ৮১ লাখ বইয়ের অপেক্ষা ‘মধ্য জানুয়ারিতে’ কাটবে বলে আশা এনসিটিবির কর্মকর্তাদের। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। উপজেলা পর্যায়ে এখনো ১২ কোটি বই পৌঁছায়নি বলে জানা গেছে। ২০২৬ সালে যথাসময়ে শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দিতে এবার অপেক্ষাকৃত আগেই পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। তবে মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে রিটেন্ডার দেওয়ায় তিন মাস দেরিতে ছাপা শুরু হয়। অন্যদিকে রিটেন্ডার না দিয়ে অজানা কারণে প্রায় আড়াই মাস নবম শ্রেণির পাঠ্যবই ছাপানোর কার্যাদেশ আটকে রাখা হয়েছিল। ছাপাখানার মালিকরা অভিযোগ করে বলেন, বর্তমানে পাঠ্যবই ছাপা দেরি হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে এনসিটিবির কাগজ সিন্ডিকেট বাণিজ্য। দেশে শতাধিক কাগজ মিল রয়েছে, এনসিটিবি মাত্র পাঁচটা মিলের কাগজ ছাড়া অনুমোদন দিচ্ছে না। এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কাগজের টন প্রতি ৭ হাজার টাকা কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। দেশে প্রতি বছর পাঠ্যবই ছাপাতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১ লাখ টন কাগজ।
গতকাল ঢাকার আবুল বাশার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, নতুন বছরের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শতভাগ পাঠ্যবই বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে। এ বইগুলোর মান আগের তুলনায় নিশ্চিতভাবেই ভালো বলে তিনি জানান। বই বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে উপদেষ্টা বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে একটি অভিভাবক নির্দেশিকা বই প্রস্তুত করা হচ্ছে, যা খুব শিগিগরই আপনাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
নতুন বছরের বই পেল মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ২৪ লাখ ৩০ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থী। ‘নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ উন্নয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৮ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে ৭৩ হাজার ৭৬৮টি কেন্দ্রের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭০৪টি বই বিতরণ করা হয়। ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে বই বিতরণ কার্যক্রম-২০২৬-এর উদ্বোধন করেন।















Discussion about this post